Home আরো অর্ধযুগে জাতীয় সংসদ থেকে ২০০ কোটি টাকা হাতিয়েছেন সমীরণ মিস্ত্রী

অর্ধযুগে জাতীয় সংসদ থেকে ২০০ কোটি টাকা হাতিয়েছেন সমীরণ মিস্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি:

উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, দীর্ঘদিন একই বিভাগে কাজ করা এবং তাকে নিয়ে ভারত গমনই নয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রী অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে হরিলুট করে নিয়েছেন প্রায় দুইশতকোটি টাকা। মূলত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল ৩ এর গণপূর্ত ই/এম বিভাগ ৭-এ (জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা) কর্মরত থাকা অবস্থায় নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রী অবৈধভাবে এতো বিপুল টাকা কামানোর মিস্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। প্রায় ৭ বছর ধরে জাতীয় সংসদ ভবন গণপূর্ত ই/এম বিভাগ ৭-এ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হিসেবে মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন তিনি। আবির্ভূত হয়েছিলেন জাতীয় সংসদের টাকাখেকো ইঞ্জিন হিসেবে। এখনো বহাল তবিয়তে আছেন সমীরণ মিস্ত্রী। গত ১ সেপ্টেম্বর গণপূর্তের ইএম বিভাগ-৭ থেকে সমীরণ মিস্ত্রীকে পিএন্ডডি বিভাগ-১ এ বদলি করা হয়। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকে বদলি করা হয় সেখানে।

 

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে-নির্বাহী সমীরণ মিস্ত্রী আমব্রেলা প্রজেক্টের আওতায় জাতীয় সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ টি দরপত্রের মাধ্যমে অঙ্গভিত্তিক প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কার্যাদেশ প্রদানকারী কর্মকর্তা ছিলেন সমীরণ মিস্ত্রী নিজেই। আর তাই তিনি নিজস্ব বলয়ের ঠিকাদারদের মাধ্যমে কথিত এ কাজ সম্পাদন করেছেন বলে অভিযোগ আছে। কোন ঠিকাদারই নিজে কোন কাজ করেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন-সমীরণ মিস্ত্রী ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ টাকা নিজে নিয়ে বিল প্রদান করেছে। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধারীকে জিজ্ঞাসাবাদে যার সত্যতা পাওয়া গেছে।

সূত্রে প্রকাশ, এপিপি আওতায় গণপূর্ত ই/এম ৭ এর বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকার। এবং অপারেশন প্ল্যান (ওপি) ১৩৮ এবং স্বাস্থ্য মেরামত খাতে বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। উক্ত বরাদ্দকৃত টাকার সিংহভাগই সমীরণ মিস্ত্রির নেতৃত্বে লোপাট হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, আমব্রেলা প্রজেক্ট এবং ওপি প্রকল্পের মাধ্যমে মেরামত ও সংস্কার কাজ সম্পাদন করা হলেও এপিপি এর মাধ্যমে ছোটখাটো যেসব দরপত্র আহবান করা হয় তার পুরোটাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিশেষভাবে লুটপাট করা হয়েছে- বঙ্গবন্ধু জন্ম শতবার্ষিকীর নামে। বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ কাজ না করেই সৈয়দ ইলেকট্রিক এন্ড কোম্পানির মাধ্যমে (বিডিএফ হসপিটাল এর মালিক মোশারফ) প্রায় ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

তাছাড়া ২৩-২৪ অর্থবছরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এটুএম ইয়োলো, রকেট- এদের স্বত্বাধিকারী এ টু এমের মামুন, ইয়োলোর রাজিব, বরিশালের রকেট, বি হোসেনের বেলায়েত এদের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা কতিপয় এডজাস্টের মাধ্যমে উপবিভাগ ১৪ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসী দিশার মাধ্যমে হাতিয়ে নেন সমীরণ মিস্ত্রি। এভাবে ছয় বছরে ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। যার অধিকাংশই প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার করেছেন সমীরণ মিস্ত্রি। তার নিজ জেলা সাতক্ষীরায় এক ডজনের বেশি মাছের ঘের আছে।

অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে-২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এর উদ্দেশ্যে জাতীয় সংসদ ভবনে স্থাপিত ড্রাই টাইপ ট্রান্সফর্মার। যেটির মেয়াদকাল ছিল ১০০ বছর। তা পরিবর্তন করা হয় এডেক্স কর্পোরেশনের মাধ্যমে। যার দরপত্র মূল্য ছিল প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। টেকসই জিনিস থাকার পরেও, ২০৮২ সাল পর্যন্ত মেয়াদ থাকার পরও নতুন ড্রাই টাইপ ট্রান্সফরমার বসানো হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবনে। ঠিকাদারের পুরো বিল পরিশোধ করা হলেও অদ্যাবধি কাজের কাজ কোন কিছুই হয়নি।

সংসদ ভবনের এমপি হোস্টেলের সংস্কার বা রেনোভেশন এর নামে কোটি কোটি টাকার প্রাক্কলন করা হলেও সরজমিনে দেখা যায় এমপিদের অফিস কক্ষে দৃশ্যমান বৈদ্যুতিক সংস্কারে কোন কাজই হয়নি।

উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুলের ভাই রাসেলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও প্রায় সাত-আট কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন সমীরণ মিস্ত্রী। সরকারের একজন মন্ত্রীসহ জিলানী নামের একজন কর্মকর্তাকেও নির্বাচনের সময় মোটা অংকের টাকা দিয়েছেন এই সমীরণ মিস্ত্রি।

গণপূর্ত ইএম বিভাগ-৭ এর বহুল আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রী ও তার অধীনের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয়েছে বিস্তর। এবার সেই আলোচনাকে সত্যে রূপ দিলো তাদের বদলি আদেশ। বলা হচ্ছে, সমীরণ-ওয়াসী জুটি গণপূর্তের উত্তম-সুচিত্রা জুটিতে পরিণত হয়েছে। ফলে একজন আরেকজন কাছাকাছি ছাড়া থাকতে পারেন না।

গত ১ সেপ্টেম্বর গণপূর্তের ইএম বিভাগ-৭ থেকে সমীরণ মিস্ত্রীকে পিএন্ডডি বিভাগ-১ এ বদলি করা হয়। ইএম বিভাগ-৭ এ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আনোয়ার হোসেনকে। এর আগে দীর্ঘ ৭ বছর গণপূর্তের সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস ডিভিশনে দায়িত্ব পালন করেন সমীরণ মিস্ত্রী। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদকে ব্যবহার করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। কখনো কখনো তিনি শেখ হেলাল, শেখ জুয়েল ও তার স্ত্রীকে ব্যবহার করে নিজের পোস্টিং টিকিয়ে রেখেছিলেন।

শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর এসব মাফিয়া প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ সেপ্টেম্বর সমীরণ মিস্ত্রীকে ইএম পিএন্ডডি বিভাগ-১ এ বদলি করা হয়। তিনি ইএম বিভাগ-৭ এর দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন পদায়নকৃত পদে যোগদান করেছেন। কিন্তু মন পড়ে ছিল সিফাত ওয়াসীর কাছে। অবশেষে প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে দেখা করে সিফাত ওয়াসীকে তার অধীনে বদলির অনুরোধ জানালে ১৩ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) সরকারি ছুটির দিনে সিফাত ওয়াসীকে সমীরণের অধীনে বদলি করা হয়।

ইএম বিভাগ-৭ এর অধীনে প্লানিং কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন সিফাত ওয়াসী। নিজ আওতাধীন এলাকায় দায়িত্ব পালনে চরম অদক্ষতা ও দুর্নীতির পরিচয় দেন সিফাত ওয়াসী। দায়িত্ব পালনের পুরো সময়টিতেই তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীর সঙ্গে লেপ্টে ছিলেন।

এ নিয়ে সে সময়ে নানা কথাবার্তা উঠলেও সমীরণ তার ক্ষমতাবলে আগলে রেখেছিলেন সিফাত ওয়াসীকে। সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের স্ত্রী সিফাত ওয়াসীকে বদলি করার জন্য প্রধান প্রকৌশলীকে অনুরোধ জানালেও সমীরণ নিজ ক্ষমতাবলে তা আটকে দিয়েছিলেন। সে সময়ে গুঞ্জন উঠেছিল তারা বিয়ে করেছেন।

শর্ট ডিভোর্স সিফাত ওয়াসীকে দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গেল জীবন-যাপন করলেও শুধুমাত্র সমীরণের কারনে অন্য কোথাও বিয়ে করেননি। তাকে তার বোন, বন্ধু ও সহকর্মীরা বিয়ের জন্য চাপ দিলেও নানা অজুহাতে এড়িয়ে গেছেন। এবারের পোস্টিংয়ের পর সবার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে যে, যত চেষ্টাই করুক না কেন সিফাতকে সমীরণ থেকে আলাদা করা কঠিনই শুধু নয়, অসম্ভব।

সেখানেই অর্থ পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। দুদকের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত শত কোটি টাকার সম্পদের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে। তারপরও রহস্যজনক কারণে তার বিষয়ে তদন্ত আর গতি পায় না। দফায় দফায় তদন্ত হয়, নতুন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ হয়। তবে, ধরাছোয়ার বাইরেই থেকে যান সবার কাছে পরিচিত মিস্ত্রী নামের সমীরণ মিস্ত্রী। যদিও তিনি কোনো সাধারণ মিস্ত্রী নন। দরজা জানালা কিংবা টিনের ঘর নির্মাণ করার মিস্ত্রী তিনি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীর অনিয়ম দুর্নীতির মূলত সংসদ ভবনের মিস্ত্রী। টাকা বানানোর মিস্ত্রী হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত তিনি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল ৩ এর গণপূর্ত ই/এম বিভাগ ৭-এ কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রী।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here